মূল কনটেন্টে যান
মেনু খুলুন
লিস্টোলেট

আবু সাইদের মৃত্যু ভাবায়

 “ হামার ভাইয়ের এতো মেধা ভাই? হামার ভাই ফাইভে বিরতি পাইচে, হামার ভাই এইটে পাচে, হামার ভাই মেত্তিকে পাচে , ইন্টারে রংপুর - কলেজত ভাই , সরকারি কলেজত - স্কলারশিপ পাইচে ভাই ।বাপে হামার খুশিতে কান্দিচে ভাই । হাইরে, স্কলারশিপ পাচে ভাই! হামরা মূর্খ মানুষ- জানিনা । এতো মেধাবী ছাত্রক …

লিখেছেন sarwar

৬ মিনিটে পড়া যাবে

 

“ হামার ভাইয়ের এতো মেধা ভাই? হামার ভাই ফাইভে বিরতি পাইচে, হামার ভাই এইটে পাচে, হামার ভাই মেত্তিকে পাচে , ইন্টারে রংপুর - কলেজত ভাই , সরকারি কলেজত - স্কলারশিপ পাইচে ভাই ।বাপে হামার খুশিতে কান্দিচে ভাই । হাইরে, স্কলারশিপ পাচে ভাই! হামরা মূর্খ মানুষ- জানিনা । এতো মেধাবী ছাত্রক ভাই , কি জন্যে সরকারে মারার অনুমুতি দিল- ভাই, কি জন্যই? । আমার ভাই রোকেয়া ভারসিটিট ইংলিশ সাবজেক্ট নিয়া অনার্স করল ভাই। চার বছর হইছে - ভাই, আমার ভাইওক আমি কচনু ভাই , মাইনসে বিসিএস করে কাংগ করি ভাই, তোরা আকনা করেনতো , কয়- সুমি- এটা একটা পরীক্ষার চাকরি । হউক মুই চেষ্টা করিম । হউক মুই তোর আশাটাও চেষ্টা করি দেকিম । করেন ভাই, মক ভালো লাগে । মাইনসে যখন বিসিএসএর কথা কয় , মোর কলিজাটা কাপি ওটে ভাই । হাইরে ; ওরা কাংগ করি পড়ছে । তোরাও ভাই করেনতো । তোমারও না মেলা মেধা ? হউক সুমি - মুই করিম। হামার ভাই , মরার বয়স হয় নাই। হামার ভাইওক কিসক মারার পারমিশন দিল? একটা পাও ভাঙ্গিল না ক্যা । একটা হাত ভাঙ্গিল না ক্যা। হামার ভাই- তকন আপন ইচ্ছায় ঘুরি আইল , আয় । কি জন্য ৪ টা গুলি করিল হামার ভাইওক । হামার কইলজাটা মানছে না । হামাক তিনটা মারি গেল না ক্যা ? হামাক তিনটা কি জন্যই মারি গেল না। হামার ভাই এতো কষ্ট করি পড়ছে - ভাই । হামার বাপে মাইনসক কয়া বেরাইচে । হামার বাপে লেখা পড়ার খরচ দিবার পারে নাই। অভাব অনটনের জন্য ভাই । হয় ভাই- হামার বাপে লেখাপড়ার খরচ দেয় নাই , হামার ভাই” .... শহীদ আবু সাইদের বোন - সুমি ।


কি নিসংস ? কি নির্মম ?

আমি যখন এই লিখা লিখি। চোখে জল ধরে রাখতে পারছিলাম না। লিখা আসছিল না। কিভাবে লিখা এগিয়ে নিব, কি লিখব ঠিক বুঝে উটতে পারছিলাম। শুটের ভিডিওটা যখন দেখছিলাম। আহারে! প্রথম গুলিটা লেগেও যেন সাইদ বুঝে উঠতে পারে নাই, ততক্ষণে স্বাধীন বাংলাদেশের বুকের মধ্যে দিয়ে পরাধীনাতার নতুন দ্বার উন্মোচন হয়েছে। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে তিলে তিলে , দিনে দিনে ,বছরের পর বছর এক মেয়াদউত্তীর্ণ অসভ্যতা মেধার কাঁধে ভর করেছে আধুনিক ফেরাউন।কোটি মানুষের ধিক্কারেও যার নির্লজ্জতা ঢাকা পড়ে না। এখান থেকে মুক্তি মিলবে কবে? এই দৃশ্যমান অপশক্তির পরাজয় কিভাবে ঘটবে? কোন নতুন প্রদীপের আলোয় আলোকিত হবে আগামীর বাংলাদেশ?


এতো সুন্দর একটা দেশ? এতো বিচিত্র ? এতো সম্পদ? এতো ধন আর প্রাচুর্য? তার পরিণতি এই রকম? কি করুন ? এই ভাবে শেষ করে দেয়া হচ্ছে সোনার বাংলাদেশকে। আর নির্লজ্জতার শীর্ষচূড়ায় শাসকগোস্টই  নিজেদেরকে নিয়ে যাচ্ছে।এখানে কে মরল, কত মায়ের বুক খালি হল, কত বোন আবার নতুন করে অবাক হবে আর ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে তাকিয়ে থাকবে বোবার মত। কোনও কিছুই শাসক গোসটির মাথার টনক নড়াতে পারবে না। কত ভাই নতুন স্বপ্ন দেখতে গিয়ে থেমে যাবে, এগুতে পারবেনা। কত বউয়ের কপালের সিঁদুর মুছে যাবে তার স্বামী উধাও হবার কারণে? কিছুই যায় আসবেনা তাদের কাছে। অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে গেল ? বাবসা প্রতিষ্ঠান তার মূলধন হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গেল, কত মানুষ জবলেস হয়ে গেল। বিদেশীরা বিদ্বেষ নিয়ে মুখ ফিরিয়ে অন্য পথে চলে গেল , তবু তাদের কিছুই যায় আসেনা।কারণ বেঁচে থাকার জন্য যে সামান্য মৌলিক চাহিদাগুলির প্রয়োজন - তাদের তার তুলনায় ঢেঁড় বেশি হয়ে জমা করে রেখেছে ফ্রিজের ভেতর, সেগুলি ফ্রজেন অবস্থায় পচে গলে দুর্গন্ধ ছড়ালেও , সেগুলিও তারা গলা দিয়ে ঢোকাতে এতোটুকু কার্পণ্য বোধ করবে না। বমি আসলেও তারা সেগুলিও খেয়ে নিবে।তারপর পেছনের অংশ উঁচু করে ফুলিয়ে বলবে – এইটা আমার বাপের দেশ। আমি যা বলব সেইটাই হবে শেষ এবং চূড়ান্ত রায় ।


এই ঔধত্ত আচরণ একটা বিরাট সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ। এটা লাউ এর গাছের মত। যে গাছ ঠোকা ছাড়াই এগিয়ে চলে , বেড়ে ওঠার চেষ্টা করে। কিন্ত শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যেতে পারেনা আর লাউ ও ধরে না। অন্যদিকে এই জোর করে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই মাজখানের সময়ে আসে পাশে গড়ে উঠে নতুন মুখ , যারা জানে কিভাবে ঠোকা দিয়ে একটা গাছকে দাঁড় করে ফেলান যায়, আর তাকে অতি যত্নে আদর করে হাসিমুখে ফসল ধরিয়ে সেখান থেকে ফল ঘরে তোলা যায়।


শহীদ আবু সাইদের মৃত্যু- এটা অঝতা বিশাল এক লাউ গাছের মত আগাছা তৈরি হওয়া জঙ্গল আর তার ক্রাইসিস এর যথাযথ উত্তর। যে জানে সঙ্কট কে কিভাবে মোকাবেলা করতে হয়? মৃত্যুকে হাসিমুখে বরন করে নিয়ে অসভ্যতার গালে মুখে চোখে লেগে থাকা নিরবিচ্ছিন অভাবকে মুছে দেয় জাতীয় পতাকা দিয়ে।রক্তকে রাজপথে মিশিয়ে দিতে কার্পণ্য বোধ করে না। এদের রক্তেই অনাবাদী জমি পায় নতুন সম্ভবনা। এদের রক্তেই অনুরবরতা খুঁজে নেয় নতুন নিরবরতা । অতি সামান্য বেঁচে থাকা জীবনের একটা বিশাল অংশের বীজ বপন করে নির্দ্বিধায় বিলিয়ে যায় নতুন তরুণের মাঝে।মৃত্যুই তাদের কাছে অনেকদিন ধরে বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র।এরা কখনই ভয় পায় না।


আবু সাইদের বোন – সুমির কান্নায় আমি এই লিখা বেশি দূর গড়াতে পারি নাই । “চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারি নাই চিৎকার, বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার দেশে গণ্ডগোল তুঙ্গে, ধামাচাপা দিয়ে সাইদের লাশ দাফন করা হইছে। সুমির কান্নায় পৃথিবীর কোটি মানুষের হৃদয়ে বেড়েছে ক্ষত চিহ্নের দাগ। আর এই দাগ মিশতে লাগবে বহুবছর। পরবর্তী সময়ের স্ক্রিপ্তেড গল্পগুলু ছিল পরিষ্কার। সাইদের পরিবারকে গণভবনে ডাকা হবে, হাতে সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে দেয়া হবে একটা চেক।এই ঘটনাগুলি যখন ঘটছিল- আমি মনে মনে ভাবছিলাম ছেলেটার লাশ কবরে কি করছে একা একা ? ওর শরীর থেকে কি মাংসগুলি খুলে পড়ে যাচ্ছে। এতো তাড়াতাড়ি তো এগুলা হবার কথা না। ওর লাশ তো নতুন জীবন পেয়ে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে রংপুরের পার্কের মোড়ে । সেখান থেকে ট্রাভেল করবে দেশের সবগুলি ঘুণে ধরা জায়গায়। ওড় লাশ ঠক ঠক করে করা নাড়বে গণভবনে, বঙ্গভবনে, জাতীয় উদ্যানে, সংসদ ভবনে। যে পুলিস ওর বুকে গুলি চালিয়েছে, তার মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সকাল সন্ধ্যা তাকে আদর করবে, কষ্ট পেলে বুকে জড়িয়ে নিবে, ঘামলে ঘাম মুছে দিবে।ছায়ার মত লেগে থাকবে তার সকল ওঠা বসায়। প্রধানমন্ত্রী ঘুম থেকে উঠে দেখবে , আবু - তার মাথার কাছে বসে আছে, এয়ার কন্ডিশন রুমে গরমে ঘামছে প্রধানমন্ত্রী , আর সাইদ পাখা দিয়ে তাকে বাতাস করছে। হিপপদিমাসের মত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে বলবে , এই বাংলাদেশ আমরা চাইনিরে - দাদাঠাকুর । আবু সাইদ ট্রাভেল করবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে। বলবে- আমার রক্ত দিয়ে লেখ? তারপরেও সত্যিটাই লেখ। যা ঘটেছে একদম সেইটাই লিখ।মানচিত্রের বেড়াজাল ভেদ করে সকল প্রবাসীদের কাছে গিয়ে শক্তির নতুন হাতিয়ার হয়ে উটবে।বলবে হাল ছেড়ো না ভাইবোনেরা। সাইদ দুনিয়ার সব বঞ্চিত মানুষের কাছে এক জ্বলন্ত অগ্নিশিখা হয়ে আলো ছড়িয়ে বলবে, এখনও শেষ হয়ে যাইনি সবকিছু। বেঁচে থাকবার মত আরও অনেক সময় আছে এখনও। জীবন কে উপভোগ করবার মত অনেক উপকরণ আছে এখনও এই দুনিয়াতে। এমনকি সাইদ হোয়াইট হাউসে গিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে বলবে, আমি শান্তির দূত আর তোমরা যে দুনিয়া জুড়ে এতো অত্যাচার আর অনাচার করছ সেটা থামাও।শান্তি নামাও দুনিয়ার বুকে।


আবু সাইদরা মরেনা, প্রত্যেকদিন মরি আমরা । যারা সাইদের মত দুর্বার গতির মানুষকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে দিতে বাধ্য করি। আবু সাইদের লাশ ও পচার কথা না। ওর লাশ তো মমি হয়ে থাকবে যুগের পর যুগ। সেই মমির হাসির উপ্সতিথি ঘুরে বেড়াবে আমদের অঝতা বেঁচে থাকায়। খাবরা টেবিলে আড্ডায়,ফ্রিজের ভেতরে।


আমার জন্ম , বেড়ে ওঠা , বাসা রংপুরে। এই শহরের প্রত্যেকটা অলিগলি আমার চেনা। পার্কের মোড়ে কত আড্ডা হয়েছে । সেখানে আবার হয়তো কোনদিন যাবো, দাঁড়িয়ে থাকবো বিমূর্ত হয়ে, সুমির সুরে আমিও জোরে জোরে আমার প্রাণের ভাষাতেই বলব হামার কইলজাটা মানছে না” ।

 

আবু সাইদ- ভালো থেকো বন্ধুবর। ভালো থেকো।


সাইদের বোন – সুমির কান্নায় আমি এই লিখা বেশি দূর গড়াতে পারি নাই। আমি পারি নাই................


এই লেখাকে রেটিং দিন

মন্তব্য

এখনও মন্তব্য নেই