মূল কনটেন্টে যান
মেনু খুলুন
লিস্টোলেট
ভুতের গল্প

ভয়ের ভেতরেও এক আকর্ষণের গল্প

ভয়- মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন অনুভূতিগুলোর একটি। আগুন, অন্ধকার, মৃত্যু, অজানা- এইসব ভয় থেকেই গল্পের শুরু। আর এই ভয়কে শিল্পে রূপ দিয়েছে হরর ঘরানা। গল্প, সিনেমা, নাটক বা সাহিত্য- যেখানেই হোক, ভয়কে কেন্দ্র করে যে বিশেষ ধারা গড়ে উঠেছে, সেটাই হরর বা ভৌতিক ঘরানা।ভয় কেন আকর্ষণীয়ভয়ের গল্প আমরা শুনতে …

লিখেছেন Enamul Huq

৩ মিনিটে পড়া যাবে

ভয়- মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন অনুভূতিগুলোর একটি। আগুন, অন্ধকার, মৃত্যু, অজানা- এইসব ভয় থেকেই গল্পের শুরু। আর এই ভয়কে শিল্পে রূপ দিয়েছে হরর ঘরানা। গল্প, সিনেমা, নাটক বা সাহিত্য- যেখানেই হোক, ভয়কে কেন্দ্র করে যে বিশেষ ধারা গড়ে উঠেছে, সেটাই হরর বা ভৌতিক ঘরানা।

ভয় কেন আকর্ষণীয়

ভয়ের গল্প আমরা শুনতে ভালোবাসি- এ এক অদ্ভুত বিষয়। যে অনুভূতি থেকে আমরা বাস্তবে পালাতে চাই, সেই ভয়কে আমরা কল্পনায় উপভোগ করি। কারণ কল্পিত ভয় আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকে। বাস্তবে ভয় আমাদের অসহায় করে, কিন্তু গল্পের ভয় আমাদের উত্তেজিত করে, রোমাঞ্চিত করে।

মানুষের মন অজানাকে জানতে চায়, নিষিদ্ধকে ছুঁতে চায়। এই কৌতূহলই হরর গল্পকে জনপ্রিয় করেছে।

হরর সাহিত্যের শিকড়

পশ্চিমে হরর সাহিত্যের শুরু হয় আঠারো শতকে। ম্যারি শেলির Frankenstein, ব্রাম স্টোকারের Dracula, আর এডগার অ্যালান পো’র অন্ধকার গল্পগুলো হরর ঘরানাকে গভীরতা দেয়। পরবর্তীতে স্টিফেন কিং বা এইচ.পি. লাভক্রাফট হররের ভেতর মনস্তত্ত্ব ও অদ্ভুততাকে মিশিয়ে দেন।

বাংলা সাহিত্যে ভৌতিক গল্পের ঐতিহ্যও কম পুরনো নয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাঁদের পাহাড় থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথের খনার বচন বা কঙ্কাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের তীক্ষ্ণলোচন, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের গল্প- সব জায়গাতেই ভয় কখনো বাস্তব, কখনো অদ্ভুত এক অনুভূতি হিসেবে ফিরে আসে।

হরর গল্পের ধরন

সব হরর গল্প একরকম নয়। কিছু গল্প অজানা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে কেন্দ্র করে- ভূত, আত্মা, ডাইনী বা অভিশাপ। কিছু গল্প আবার মনস্তাত্ত্বিক- যেখানে ভয়ের উৎস মানুষের ভেতরেই। আধুনিক কালের হররে এই দুই দিকই মিশে গেছে। যেমন, কোনো চরিত্রের অপরাধবোধ বা পাগলামিই ভয় তৈরি করে।

সিনেমায়ও এই বৈচিত্র্য স্পষ্ট। ক্লাসিক হরর যেমন The Exorcist বা The Shining, সেখানে অতিপ্রাকৃত ও মানসিক ভয় একসাথে কাজ করে। আবার কিছু আধুনিক চলচ্চিত্র- Get Out বা Hereditary- ভয়কে সমাজ, পরিবার বা রাজনীতির প্রতীকে রূপ দিয়েছে।

বাংলায় হররের বিবর্তন

বাংলা সাহিত্য ও সিনেমায় হরর অনেকটাই নিজের ছন্দে বেড়ে উঠেছে। সত্যজিৎ রায়ের গুপী গাইন বাঘা বাইন–এর ভূতের নাচ হালকা রসিক ভয়ের প্রতীক, আর মনিহারা বা ভূতের ভবিষ্যৎ ভয়ের সঙ্গে ব্যঙ্গ ও মানবিক অনুভূতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েব কনটেন্ট ও শর্ট ফিল্মে হররের নতুন ঢেউ দেখা যাচ্ছে। যেমন, সামাজিক ভয়, লোককাহিনি, বা শহুরে কিংবদন্তির ভেতরে লুকানো আতঙ্ক এখন নতুন করে উঠে আসছে পর্দায়।

ভয় শুধু ভয়ের জন্য নয়

হরর গল্প কেবল ভয় দেখানোর জন্য নয়; এটি সমাজের ভেতরকার ভয়কেও প্রকাশ করে। যেমন- অন্যায়, অপরাধ, মৃত্যু, ধর্মীয় কুসংস্কার বা প্রযুক্তির ভীতি। হরর আমাদের শেখায়, ভয়কে সরাসরি মোকাবিলা করতে হয়, পালিয়ে নয়।

একভাবে দেখলে, হরর ঘরানা মানুষের অস্তিত্ববাদী প্রশ্নেরই প্রতিফলন- আমরা কেন ভয় পাই, কী থেকে পালাচ্ছি, আর শেষ পর্যন্ত কে বা কী আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে।

কেন হরর এখনো টিকে আছে

সময়ের সঙ্গে ভয় বদলেছে। আগে আমরা ভূত বা আত্মাকে ভয় পেতাম, এখন ভয় পাই প্রযুক্তিকে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতাকে, মনস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাকে। হরর ঘরানা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। তাই হরর সবসময়ই সমকালীন- যতই সময় এগিয়ে যাক, ভয় তার জায়গা ধরে রাখবে।

উপসংহার

ভয়ের গল্প আসলে জীবনের গল্প। কারণ ভয় না থাকলে মানুষ বাঁচতে পারত না, আবার ভয়ই মানুষকে সচেতন করে তোলে। হরর ঘরানা সেই অনুভূতিকেই শিল্পে রূপ দিয়েছে- যেখানে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকে আলো খোঁজার তাগিদ।ভয় আমাদের কাঁপায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেখায়- সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস বাইরের নয়, ভেতরের।

এই লেখাকে রেটিং দিন

মন্তব্য

এখনও মন্তব্য নেই