Skip to main content
Open menu
Listolet
Blog

যেখানে পালকি থামে, সেখানেই শুরু হয় দায়িত্ব

একজন বাবার শেষ উপদেশ, এক ছেলের আজীবনের শিক্ষাবিয়ের আগের রাত।ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে। বাইরে উৎসবের শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে।রিয়াদ বসে আছে নিজের বিছানার প্রান্তে— এক অচেনা উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও এক অদ্ভুত শূন্যতা।এমন সময় বাবা নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলেন।চিরচেনা মুখটি আজ যেন কিছুটা আলাদা— গম্ভী…

By Sonia Rahman

3 min read
একজন বাবার শেষ উপদেশ, এক ছেলের আজীবনের শিক্ষা

বিয়ের আগের রাত।

ঘরে মৃদু আলো জ্বলছে। বাইরে উৎসবের শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এসেছে।

রিয়াদ বসে আছে নিজের বিছানার প্রান্তে— এক অচেনা উচ্ছ্বাস, আবার কোথাও এক অদ্ভুত শূন্যতা।

এমন সময় বাবা নিঃশব্দে ঘরে প্রবেশ করলেন।

চিরচেনা মুখটি আজ যেন কিছুটা আলাদা— গম্ভীর, কিন্তু স্নেহে ভরা।

তিনি এসে রিয়াদের মাথায় হাত রাখলেন। সেই স্পর্শে রিয়াদের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল।

বাবা ধীরে বললেন,

“জানিস রিয়াদ, আগেকার দিনে নতুন বউকে পালকি চড়ানো হতো কেন?”

রিয়াদ মুখ তুলে তাকাল।

বাবা নিজের কথাই চালিয়ে গেলেন—

“তাকে তো গরুর গাড়িতেও আনা যেত। কিন্তু তা করা হতো না। কারণ পালকি মানে শুধু বাহন নয়, সম্মানের প্রতীক। সেই পালকিতে বউকে উঠানো হতো যেন সবাই জানে— আজ থেকে এই মেয়েটি একজনের জীবনের সবচেয়ে সম্মানিত মানুষ।”

বাবার কণ্ঠে এক ধরনের গাম্ভীর্য মিশে ছিল।

তিনি আবার বললেন,

“পালকি থেকে নামানোর পর সে সম্মান যেন কোনোদিন কমে না যায়। সারাজীবন তাকে সেই পালকির মর্যাদাতেই রাখতে হবে।”

রিয়াদ চুপচাপ শুনছিল।

বাবা একটু থেমে আবার বললেন,

“জানিস, নতুন বউ পালকিতে উঠে কী করে?”

রিয়াদ মাথা নেড়ে বলল, “না, বাবা।”

বাবা হেসে বললেন,

“সে কাঁদে। শুধু ফেলে আসা আপনজনদের জন্য নয়, অজানা জীবনের ভয়েও কাঁদে। তোর দায়িত্ব হবে, সেই পালকির কান্নাই যেন তার জীবনের শেষ কান্না হয়।”

ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

বাবার চোখে এক অচেনা আভা। তিনি বললেন,

এরপর সে কাঁদবে আর মাত্র দু’বার—

একবার মা হওয়ার আনন্দে,

আরেকবার তুই মারা গেলে।

এর মাঝখানে যত দুঃখ, যত শোক আসবে, তুই তার চোখের পানি মুছে দিবি।”

রিয়াদের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন গলে গেল।

বাবা এবার নিঃশব্দে জানালার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“বৌ সবচেয়ে কষ্ট পায় কিসে জানিস? স্বামীর খারাপ ব্যবহারে। আমি মানুষ হিসেবে বদমেজাজি, কিন্তু তোর মা বলতে পারবে না— আমি কখনো তার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেছি। বিয়ে মানে শুধু সংসার না, এক নারীর

সম্পূর্ণ জীবনের দায়িত্ব নেওয়া। এটা সঠিকভাবে পালন না করলে, সৃষ্টিকর্তার কাছে দায়ী থাকতে হয়।”

বাবার কণ্ঠে ক্লান্তি, তবু গভীর নিশ্চয়তা।

“আর একটা কথা মনে রাখিস,” তিনি বললেন,

“তোর বৌয়ের মা-বাবাকে কখনো ‘শ্বশুর’, ‘শাশুড়ি’ বলবি না। ওদের ‘মা’ আর ‘বাবা’ বলবি। কারণ তুই যেমন বলবি, তোর বৌও আমাদের তেমনই ডাকবে। এভাবেই সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, পরিবার এক হয়ে যায়।”

রিয়াদ আর কিছু বলল না। শুধু নীরবে মাথা নোয়াল।

বাবা উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। যাওয়ার আগে পেছন ফিরে বললেন,

“সৃষ্টিকর্তার পাল্লা সমান রিয়াদ। তুই এক পাল্লায় যা রাখবি— ভালোবাসা, সম্মান, সহানুভূতি— তিনি অন্য পাল্লায় ঠিক তাই রেখে ভারসাম্য রাখবেন। তাই কখনো পালকির সম্মান যেন হারিয়ে না যায়।”

বাবা চলে গেলেন।

রিয়াদ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল।

চাঁদের আলো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।

তার মনে হচ্ছিল, সেই আলো যেন এক অদৃশ্য পালকির মতো ধীরে ধীরে তার নতুন অধ্যায়কে ঘিরে ফেলছে—

জীবনএকটি অধ্যায়, যার নাম বিয়ে,

আর যার প্রথম শিক্ষা— সম্মান।

Rate this piece

Comments

No comments yet