বিদায় হে মায়েস্ত্র!
বিদায় হে মায়েস্ত্র! তুমি শুধু একজন ফুটবলার নও, তুমি কোটি হৃদয়ের আবেগ, ভালোবাসা আর শৈশবের স্মৃতি। তোমার জাদুকরি পায়ের ছোঁয়া হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তুমি চিরকাল অমর হয়ে থাকবে। বিদায় মেসি, বিদায় জীবন্ত কিংবদন্তি!একটি ছোট্ট ছেলের পায়ে শুরু হয়েছিল যে গল্প- তার নাম মে…

বিদায় হে মায়েস্ত্র!
তুমি শুধু একজন ফুটবলার নও, তুমি কোটি হৃদয়ের আবেগ, ভালোবাসা আর শৈশবের স্মৃতি। তোমার জাদুকরি পায়ের ছোঁয়া হয়তো একদিন থেমে যাবে, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তুমি চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
বিদায় মেসি, বিদায় জীবন্ত কিংবদন্তি!একটি ছোট্ট ছেলের পায়ে শুরু হয়েছিল যে গল্প- তার নাম মেসি। কিছু গল্প লেখা হয় কাগজে।কিছু গল্প লেখা হয় ইতিহাসে।আর কিছু গল্প- মানুষের হৃদয়ে লেখা থাকে।
লিওনেল মেসির গল্পটা তেমনই।রোসারিওর ছোট্ট শহরে, মাত্র চার বছর বয়সে যে ছেলেটি প্রথম ফুটবলকে নিজের করে নিয়েছিল, সে হয়তো জানত না- একদিন তার বাঁ পায়ের স্পর্শে কোটি মানুষ আনন্দে কাঁদবে। আট বছর বয়সে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে, আর মাত্র ১৩ বছর বয়সে এক অচেনা ভবিষ্যতের খোঁজে পাড়ি বার্সেলোনায়। শরীর ছিল ছোট, স্বপ্নটা ছিল অসম্ভব বড়।
তারপর শুরু হলো মেসি নামের এক বিস্ময়ের জন্ম।বার্সেলোনার জার্সিতে প্রথম দলের হয়ে যখন মাঠে নামলেন, তখন তিনি শুধু একজন প্রতিভাবান কিশোর। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই তিনি হয়ে উঠলেন এমন একজন শিল্পী, যার পা দিয়ে ফুটবল যেন কথা বলত।এক এক করে এলো লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, অসংখ্য ট্রফি, গোল, রেকর্ড, ব্যালন ডি'অর। বার্সেলোনার হয়ে তিনি ১০টি লা লিগা ও ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ অসংখ্য শিরোপা জিতেছেন।কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়- যে মানুষটি ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জিতছিলেন, নিজের দেশের জার্সিতে তার গল্পটা ছিল বারবার ভেঙে পড়ার গল্প।২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল।২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনাল।২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল।
একটার পর একটা হার।২০১৬ সালে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মেসি এমনকি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে সরে যাওয়ার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু কিছু মানুষ হেরে গিয়ে থেমে যায়। আর কিছু মানুষ হেরে গিয়ে নিজের গল্পটা নতুন করে লেখে। মেসি দ্বিতীয় পথটাই বেছে নিয়েছিলেন।
তারপর এল ২০২১।ব্রাজিলের মারাকানায় কোপা আমেরিকার ফাইনাল। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। চোখে জল।সেই কান্না ছিল শুধু আনন্দের নয়।ওটা ছিল বহু বছরের অপমান, ব্যর্থতা, অপেক্ষা আর বিশ্বাসের কান্না।তারপর ২০২২।কাতারের আকাশের নিচে আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স।
এক ম্যাচে তিন গোল করে তিন গোল হজম।শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউট।মেসি এগিয়ে গেলেন।বল জালে।আর যখন শেষ পেনাল্টিটাও জালে ঢুকল, পৃথিবী দেখল-একজন মানুষ তার জীবনের সবচেয়ে বড় অসমাপ্ত বাক্যটির শেষে অবশেষে পূর্ণচ্ছেদ বসালেন।বিশ্বকাপটা মেসির হাতে উঠল।যে ট্রফির জন্য তাকে বছরের পর বছর প্রশ্ন করা হয়েছিল, যে ট্রফির জন্য তাকে অন্য কিংবদন্তির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল- শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফিই এসে তার হাতে ধরা দিল।
কিন্তু মেসির গল্প সেখানেই শেষ হয়নি।২০২৪-এ আবার কোপা আমেরিকা।আর ২০২৬-এ, ৩৯ বছর বয়সে, নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেললেন তিনি। তারপর এল আজ সেই দিন- ৬ অক্টোবর ২০২৬।৮৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ভরা স্টেডিয়াম।আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষ ম্যাচ।শেষবারের মতো জাতীয় সংগীত।শেষবারের মতো সেই বাঁ পায়ের জাদু।বেনিনের বিপক্ষে ৩–০ জয়ে মেসি একটি গোল করলেন, করালেন আরও দুটি। কিন্তু সেদিন গোলের চেয়েও বড় ছিল বিদায়ের মুহূর্তটি। ২০৮ ম্যাচ, ১২৬ গোল- আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ হলো ২১ বছরের এক মহাকাব্য।ভাবুন তো- একটি ছোট্ট ছেলে ফুটবল নিয়ে দৌড়েছিল রোসারিওর রাস্তায়।একদিন সে বার্সেলোনায় গেল।তারপর পৃথিবী জয় করল।কিন্তু সবচেয়ে বড় জয়টা ছিল অন্য কোথাও- সে প্রমাণ করেছে, প্রতিভা মানুষকে বিখ্যাত করতে পারে;কিন্তু বারবার ভেঙে গিয়েও উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই একজন মানুষকে কিংবদন্তি বানায়।
মেসি আমাদের শুধু গোল শেখাননি।শিখিয়েছেন ধৈর্য।শিখিয়েছেন নীরবতা।শিখিয়েছেন হারকে বুকে নিয়ে আবার মাঠে ফিরতে।আজ আর্জেন্টিনার জার্সিটা হয়তো তার শরীর থেকে খুলে গেছে।কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যাবে- মেসি কি সত্যিই বিদায় নিলেন?না।কারণ কিংবদন্তিরা মাঠ ছাড়ে,কিন্তু মানুষের স্মৃতি থেকে কখনো অবসর নেয় না।
বিদায় হে মায়েস্ত্রো।তোমার বাঁ পায়ের গল্প শেষ হলো না- শুধু মাঠের আলোটা আজ একটু নিভে গেল।
Rate this piece
Comments
0No comments yet




